ঢাকা,
মেনু |||

ফসলের ক্ষেতে মরণ ফাঁদ

খোকন আহম্মেদ হীরা:

বোরো, আমন ও রবি শষ্যের ক্ষেতে কৃষকের স্বপ্নে আঘাত হানে অতীব ক্ষুদ্র প্রাণী ইঁদুর। দেশের উৎপাদিত ফসলের ১২ থেকে ১৫ লাখ টন খাদ্য শষ্য ক্ষুদ্র প্রাণী ইঁদুর বিনষ্ট করে। যে খাদ্য শষ্য দেশের ৬০ লাখ মানুষের খাবার চাহিদা মেটাতে পারতো।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ইদুরের বিষয়ে কৃষকদের সচেতনতার পাশাপাশি ইদুর নিধনে সরকার কৃষি অধিদপ্তরের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহন করেছে। তবুও ইদুর নিধনে কৃষকরা কৃষি ক্ষেতের ফসল রক্ষায় ক্ষেতে বৈদ্যুতিক তার দিয়ে মরন ফাঁদ ব্যবহার করছে। এতে ইদুর নিধনের ফাঁদে পরে অসাবধানতাবসত কৃষকদের যেমন মৃত্যু হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষও মারা যাচ্ছেন। এছাড়াও এ মরন ফাঁদ ব্যবহার করে পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পূর্বে ফসলের ক্ষেতে বৈদ্যুতিক সংযোগ দিয়ে ইঁদুর নিধন তেমনটা না থাকলেও বর্তমানে কৃষকের ক্ষেতে ইঁদুরের অত্যাচার দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরুপায় হয়েই কৃষকরা ক্ষেতে বিদ্যুত সংযোগ দিয়ে ইঁদুর নিধন করছেন।

সূত্রমতে, বিগত কয়েক বছরের ব্যবধানে সারাদেশের ন্যায় বরিশালের বিভিন্ন উপজেলায় বোরো ও আমন মৌসুমে ফসলের ক্ষেতের ইঁদুর নিধন করতে গিয়ে কৃষকের পাশাপাশি কৃষি ক্ষেতে রাখা বৈদ্যুতিক তারে মৃত্যু হয়েছে একাধিক ব্যক্তির। এছাড়া গৌরনদী উপজেলার শরিফাবাদ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা হারুন-অর রশিদের একমাত্র পুত্র লালন সরদারকে ইঁদুরের জন্য পাতা ফাঁদে ফেলে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগও উঠেছিলো। কিন্তু সঠিক প্রমানের অভাবে বিচার পায়নি ওই মুক্তিযোদ্ধা পরিবার।

সর্বশেষ গত শনিবার (২ সেপ্টেম্বর) রাতে গৌরনদী পৌর এলাকার কাসেমাবাদ মহল্লার আজাহার বেপারীর আমন ক্ষেতে ইঁদুর নিধনের জন্য পাতা বিদ্যুতের ফাঁদে পরে প্রাণ হারিয়েছে নাজমুল ইসলাম নামের এক যুবক। আগামী এক সপ্তারের মধ্যে কর্মস্থলের সুবাধে ফ্রান্সে যাওয়ার কথাছিলো মৃত নাজমুলের। অনাকাঙ্খিত এসব মৃত্যুতে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবার অপরদিকে একটু অসাবধানতার কারনে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক পরিবার।

ইঁদুর নিধনের পদ্ধতি ॥ কীটতত্ত্ব বিভাগ, ব্রি, গাজীপুরের দুই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ মোফাজ্জল হোসেন ও মোঃ মোসাদ্দেক হোসেনের তথ্যমতে, আমন মৌসুমের ভাদ্র থেকে মধ্য কার্তিক মাস ইঁদুর দমনের উপযুক্ত সময়। কারণ এ সময়ে মাঠে ইঁদুরের সংখ্যা কম থাকে। জমিতে পানি থাকায় ইঁদুর মাঠের উঁচু স্থানে, সড়ক, বাঁধ, পুকুরের পাড়, ধানের জমির পাশে অবস্থান করে। এসময় আমন ফসল ক্ষতি করার আগেই ইঁদুর মারতে পারলে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি কম হয় এবং ফসলের ক্ষতিও অনেক কম হয়ে থাকে। ধান রোপণের সময় ও রোপণের ৪৫ থেকে ৫০ দিনের মধ্যে ধানের জমি ও আশপাশের এলাকার ইঁদুর দমনের ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

সূত্রমতে, সড়ক ও মহাসড়কের ইঁদুরের নতুন গর্তে, ফসলের মাঠে, পুকুর পাড়ের গর্তে, ফসলের মাঠের উঁচুস্থানে, ঘরবাড়ির ও আশপাশের ইঁদুরের নতুন গর্তে, জমিতে যখন পানি থাকে ও ধানে থোড় আসার আগে ইঁদুর দমন করতে হবে। রাস্তাঘাটের ইঁদুর মাঠের পানি সরে গেলে আমন ক্ষেতে ঢুকে পড়ে এবং বিপুল ক্ষতি করে। তাই জমির পাশে রাস্তার ও উঁচু জায়গার ইঁদুর জমিতে প্রবেশ করার আগেই মেরে ফেলা উচিত। মাঠে ফসস বৃদ্ধির সাথে সাথে ইঁদুর প্রজনন প্রক্রিয়াও চালাতে থাকে। তাই ফসলের থোড় ও পাকা অবস্থায় ইঁদুর দমন ব্যবস্থা ততোটা কার্যকর হয়না। কারণ এসময় মাঠে ইঁদুরের সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে যায়। ইঁদুরের ক্ষতির মাত্রা বেশি হলেই কেবল ইঁদুরের উপস্থিতি বুঝা যায়, তখন দমন ব্যবস্থা ততোটা কার্যকরী হয়না। কারণ মাঠের ফসল রেখে ইঁদুর বিষটোপ খেতে চায়না এবং দমন খরচ অনেক গুণ বেড়ে যায়।

কিভাবে ইঁদুর দমন করা যায় ॥ ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতির ধরন, এর ব্যাপকতা ও দমন প্রক্রিয়া অন্যান্য বালাই থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও কৌশলগত। তাই স্থান কাল পাত্রভেদে কৌশলের সঠিক ও সমন্বিত দমন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে ইঁদুর দমন করতে হবে। এতে করে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, ইঁদুর বাহিত রোগ ও পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমানো সম্ভব হবে। তবে ইঁদুরকে সঠিকভাবে মোকাবেলা করার জন্য সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন। সবাই মিলে একযোগে বেশি জায়গার ইঁদুর মারলে ফসল রক্ষা পায় ও ইঁদুরের সংখ্যা পরবর্তীতে বাড়তে পারেনা। এজন্য সরকারীভাবে বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে ইঁদুর নিধন অভিযান পরিচালনা করা হয়ে থাকে। ইঁদুর দমনের পদ্ধতিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন ওই দুই কর্মকর্তা।

অরাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর দমন ॥ গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর বের করে মেরে ফেলা, ইঁদুরের গর্তে পানি ঢেলে ইঁদুর বের করে মেরে ফেলা, ইঁদুরের গর্তে মরিচের ধোঁয়া দিয়ে বের করে মেরে ফেলা, ক্ষেতের আইল চিকন (যেমন-৬ থেকে ৮ ইঞ্চি) রেখে ক্ষেতে ইঁদুরের প্রকোপ কমানো যায়, বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করে, একই এলাকার ধান ফসল একই সময়ে লাগানো ও কর্তন করা হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে ইঁদুরের প্রকোপ কমানো যায়, বাড়িঘর ও ক্ষেতের আশপাশের ঝোপঝাড়, জলাশয়ের কচুরিপানা পরিষ্কার রাখা, ধান ক্ষেতের চারদিকে এক মিটার উচ্চতায় পলিথিন দ্বারা ঘিরে রাখা, আগে পাকে এমন স্বল্প জীবনকালের ধান (যেমন-ব্রি-ধান-৬২) চাষ করে একে ফাঁদ ফসল হিসেবে ব্যবহার করে ইঁদুর দমন করা, বিভিন্ন যান্ত্রিক উৎপীড়ক (রিপেলেন্ট) যেমন-জমিতে ভিডিও ফ্লিম টানিয়ে, মানুষের প্রতিকৃতি জমিতে দিয়ে অথবা আল্ট্রা শব্দ সৃষ্টি করে জমি থেকে সাময়িকভাবে ইঁদুরকে সরিয়ে রাখা যায়। এছাড়াও ইঁদুর তাড়ানোর নতুন পদ্ধতি হিসেবে আমন ধান ক্ষেতে পলিথিনের ঝান্ডা উড়িয়ে সুফল পাচ্ছেন কৃষক। বাতাসের কারণে পলিথিনের পত পত শব্দ করে উড়ে আর ইঁদুর মনে করে কেউ আসছে, তাই ভয়ে পালিয়ে যায়। বেশি সময় ধরে একই উৎপীড়ক ব্যবহার করলে এর কার্যকারিতা কমে যায়।


রিয়াজ পাটওয়ারী

প্রধান ‍উপদেষ্টা: মো: ‍আবু তালেব মিয়া
প্রকাশক: মো: ‍ইনাম মাহমুদ
সম্পাদক : রিয়াজ পাটওয়ারী
যুগ্ম সম্পাদক: খান আব্বাস
প্রধান সম্পাদক: মো: কামরুল ইসলাম
সহ সম্পাদক: শরিফুল আলম সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক: শাহাদাত তালুকদার
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এম এইচ প্রিন্স
Desing & Developed BY Engineer BD Network