ঢাকা,
মেনু |||

নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দম্পতির সন্তান বলা কি ভুল হবে?

বেলায়েত বাবলু :

জাতির পিতা ব্ঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে চলা ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ। লাল সবুজের পতাকা খোচিত বাংলাদেশ। দেশটাকে পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্ত করতে ত্রিশ লাখ মানুষ তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এক লাখ মা- বোন হারিয়েছেন তাঁদের সম্ভ্রম। যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন ও জীবনবাজী রেখেছেন তাঁদের সেই ত্যাগকে কোন কিছুর বিনিময়ে মূল্যায়িত করা যাবেনা। তারপরেও আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মানবতার মা দেশরতœ শেখ হাসিনা সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সন্মান দেয়ার জন্য নানামূখী পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। বোধকরি দেশের এসকল বীর সেনানীরা বর্তমান সময়ে সর্বোচ্চ সুবিধাভোগ করছেন। আমি প্রথমত দেশপ্রেমী, আত্মত্যাগকারী এক দম্পত্তির সন্তান হিসেবে নিজে নিজে গর্ববোধ করি। আমার মা- বাবা সনদধারী মুক্তিযোদ্ধা না। হয়তো নামের তালিকায় তাঁরা নাম অর্ন্তভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু তারপরেও আমি মনে প্রানে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দম্পত্তির সন্তান হিসেবে দাবি করি। এ দাবির পিছনে যৌক্তিকতা আসে। যদি বলা হয় আমার মা- বাবা সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন কিনা, আমি বলবো না। তাহলে কি প্রশ্ন উঠবে তারা কিসের মুক্তিযোদ্ধা? মা- বাবার কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে তাঁদের যে অবদানের কথা শুনেছি তাতে আমি খুব জোর দিয়ে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দম্পত্তির সন্তান বলে দাবি করতেই পারি। এখানে বলে রাখা ভালো এ দাবি জোর দিয়ে করা গেলেও আমি দাবি করছিনা আমার মা- বাবার স্বীকৃতি কোথায়? আমি বলছিনা তাদের সকল সুবিধা দেয়া হোক। আমি এ লেখার মাধ্যমে আমার মা- বাবার যুদ্ধকালীন সময়ের অবদানের কিছু কথা সকলের সাথে শেয়ার করার চেষ্ঠা করছি মাত্র। আমার বাবা ও মা দুজনেই বরিশাল নগরীর কাটপট্টি রোডে জন্মগ্রহন করে সেখানেই বেড়ে উঠেছেন বাবা খোকা মিয়ার কাছ থেকে জেনেছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যুদ্ধ ঘোষনার পর তিনি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। সে অনুযায়ী তিনি বরিশালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে গঠিত প্রথম সচিবালয় বর্তমানের বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অন্যান্য বীর যোদ্ধাদের সাথে প্রশিক্ষন গ্রহন করেন। তিনি সশস্ত্র যুদ্ধে যাওয়ার আগে পরপর দুইবার পাক হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। কিন্তু শারিরীক নির্যাতনের শিকার হন দু’বারই। সম্মুখ যুদ্ধে যেতে না পারলেও আমার মা-বাবা অনেক নর নারী ও তাদের সন্তানদের প্রানে বাঁচিয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেককে নিরাপদে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে সহায়তা করেছেন। আমার মা রেবা বেগমের কাছ থেকে শুনেছি তিনি অগনিত হিন্দু নর-নারীদের আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি নগরীর চকবাজারের একটি দোকানের তালা ভেঙ্গে সেখান থেকে টুপি লুট করে নিয়ে এসে প্রানভয়ে থাকা হিন্দু পুরুষদের পরিয়েছেন। আমার মা নিজ হাতে বটি দিয়ে গোঁফ কেটে হিন্দু পরিবারের অনেক পুরুষ সদস্যকে টুপি পরিয়ে ভারতে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমার মা যুদ্ধের ভয়াবহ সময়টাতে কাটপট্টি রোডের পুকুরে বঙ্গবন্ধুর নৌকা ভাসিয়েছিলেন। বরিশাল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবদুল মালেক খানের বাসা থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে নৌকাটিতে আলোর ব্যবস্থা করেছেন। আমার মা যুদ্ধকালীন সময়ে কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। শুনেছি বর্তমান সময়ের পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন সম্পর্কিত কমিটির আহবায়কের দায়িত্বে থাকা মাননীয় মন্ত্রী জনাব আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ মহোদয় একবার কোতয়ালী থানার তালা ভেঙ্গে আমার মাকে মুক্ত করে এনেছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু মুজিব বরিশাল সফরে এসেছিলেন। তখন আমার মা তাঁর সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধকালীন সময়ে আমার মায়ের অবদানের কথা শুনে তাঁকে জিজ্ঞাস করেছিলেন তাঁর কাছ থেকে আমার মা কি আশা করেন? নির্লোভী আমার মা একবাক্যে বলেছিলেন তাঁর কিছুই চাইনা। তখন বঙ্গবন্ধু মুজিব তাঁর সাথে থাকা নিজের একখানা সাদা কালো পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিয়ে বলেছিলেন তাহলে এটা রেখে দেও। অনেক বছর ওই ছবিটা মা আগলে রেখেছিলেন কিন্তু একবার বাসা পরিবর্তনের সময় অনেক কাগজ সাথে পত্রের অমূল্য সেই ছবিখানা হারিয়ে যায়। ছবিখানা হারিয়ে মাকে আমার অনেকদিন কাঁদতে দেখেছি। ৭১ পূর্ববতী সময়ে আমার পিতা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ছিলেন। হিন্দু পরিবারে জন্ম নেয়া আমার পিতা দেশটাকে ভালবেসে, এই দেশকে স্বাধীন করার শপথ নিয়ে তাঁর মা -বাবার স্নেহ ভালবাসাকে উপেক্ষা করেছেন। যুদ্ধ শুরুর আগ মুহূর্তে তাঁর বাবা-মা দেশ ত্যাগ করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহন করলেও তিনি তাঁদের সাথে যাননি। পরবর্তীতে তাঁর বাবা- মা সেখানে বসে পরলোকগমন করলেও তাদের মুখখানা শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাননি। আমার বাবা আজো পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের চিহ্ন বয়ে বেড়ান। আজো আমার বাবা, মা বঙ্গবন্ধুর আর্দশ বুকে ধারন করেন। তাঁদের কাছ থেকে শুনতে শুনতেই আমরাও পরিবারের অন্য সদস্যরা এর বাইরে যেতে পারিনি। এইতো বলতে গেলে সেদিনকার কথা নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মা বিএনপির কর্মীদের অপকর্মের প্রতিবাদ করেছেন তার চার সন্তান ও নাতিদের নিয়ে। এক পর্যায়ে তা আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংঘর্ষে রুপ নিলেও মা আমার পিছু হটেননি। তিনি আমাদের সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাকর্মীদের সাথে রাজপথে থেকে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করেছেন। আজো চায়ের আড্ডায় কেউ বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করলে আমার বাবা প্রতিবাদী হয়ে উঠেন। কারো সাথে তর্কে লিপ্ত হন আবার কারো সাথে হাতাহাতিতে। এই বয়সে তুমি এগুলো করতে যাও কেন তা যদি জিজ্ঞাস করি তিনি বুক ফুলিয়ে বলেন বঙ্গবন্ধু ও তার মেয়েকে নিয়ে কেউ উল্টা পাল্টা মন্তব্য করলে তাঁর মাথা ঠিক থাকেন। আজ নিজের বাবা, মায়ের কথা এভাবে প্রকাশের অবশ্যই কারন আছে। কারন যারা নির্লোভী থেকে দেশের জন্য ভাবতেন আজ তাঁরা বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু পথযাত্রী। অর্থের অভাবে তাঁদেরকে চিকিৎসা করাতে পারছিনা। নগরীর হাসপাতাল রোডের ভাড়া বাসায় বসে বিনা চিকিৎসায় তাঁরা মৃত্যুর দিন গুনছেন। তাঁদের অবদানের কোন স্বীকৃতি এখনো জোটেনি, অথবা তাঁরা কারো কাছে যাননি বলে তাঁরা তাদের নায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। এতেও কোন দুঃখ নেই। তবে তাঁদের বর্তমান অবস্থার কারনে সন্তান হিসেবে অনেক কষ্ঠ হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মা,বাবা কি অবদান রেখেছেন তার স্বাক্ষী আছেন অনেকে। শুনেছি দাড়ি পাল্লা দিয়ে ওজন করে যুদ্ধের সময় মা অনেক হিন্দু পরিবারের স্বর্নালংকার মেপে নিজ জিম্মায় রেখে পরবর্তীতে আবার ফেরত দিয়ছেন। নির্লোভ আমার মা ওই সময়টা তাঁর জীবন যৌবনের কথা চিন্তা না করে অনেক হিন্দু বাড়ী পাহারা দিয়েছেন। আজ আমার সেই মা অনেকটা বিনা চিকৎসায় একটি ভাড়া বাসায় শয্যাশায়ী। আমার বাবা বার্ধ্যকের কারনে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত। পয়সার অভাবে ঠিক মতো ঔষধ খেতে পারেননা। আমার মা-বাবার মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের অবদানের কথা জেনে ৯৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান বরিশাল কমান্ডের নেতৃবৃন্দ আমাদের বাসায় গিয়ে তাঁদের দু’জনকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে এসেছিলেন।
আজ মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি আমার মা-বাবা এখনো বেঁচে আছেন। ৭১ সালে তাঁরা দেশকে ভালবেসে যে চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তাতে ওই সময়ে তাঁরা মরে যেতেন পারতেন। হয়তো তাহলে আজকে আমার মতো বাবলুর জন্ম হতোনা। শুকরিয়া সৃষ্টিকর্তার কাছে তিনি আমার মা, বাবাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন, যাদের জন্য আমি পৃথিবীর আলো দেখেছি, যাদের জন্য আমি বুক ফুলিয়ে বলতে পারি স্বীকৃতি পাক আর না পাক আমি দেশ প্রেমিক দ্বয়ের ছেলে। আমি মুক্তিযোদ্ধা দম্পত্তির ছেলে।
লেখক- সাবেক সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বরিশাল।


রিয়াজ পাটওয়ারী

প্রধান ‍উপদেষ্টা: মো: ‍আবু তালেব মিয়া
প্রকাশক: মো: ‍ইনাম মাহমুদ
সম্পাদক : রিয়াজ পাটওয়ারী
যুগ্ম সম্পাদক: খান আব্বাস
প্রধান সম্পাদক: মো: কামরুল ইসলাম
সহ সম্পাদক: শরিফুল আলম সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক: শাহাদাত তালুকদার
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এম এইচ প্রিন্স
Desing & Developed BY Engineer BD Network