ঢাকা,
মেনু |||

অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বরিশালের ডিসি

আলম রায়হান, অতিথি প্রতিবেদক :

ডিসিদের বিষয়ে নানান কাহিনী শোনা যায়। এ বিষয়ে পত্রপতিকায় খবর আসে প্রায়ই। এরমাঝে পরকীয়া প্রেমের বৃন্দাবন বানিয়ে জামালপুরের ডিসি তো কেলেংকারীর এক মনুমেন্ট বানিয়ে ফেলেছেন। রসালো আলোচনায় বলা হয়, ‘পুলিশের ডিআইজি মিজান এবং জনপ্রশাসনে ডিসি কবীর সেরা।’ জামালপুরের আলোচিত ডিসি’রর মতো বরিশালের দুইজন সাবেক ডিসি সম্পর্কে আমি মোটামুটি জানি। হয়তো এ রকম আরো অনেকে আছেন। না থাকলেও এ রকম একটি অশ্বস্তিকর পাবলিক পরসেপশন আছে। এই অবস্থার বিপরিতে দাঁড়িয়ে বিশেষ উচ্চতায় অনুকনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন বরিশালের ডিসি।

১৫ আগস্টের নৃশংসতার স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানটি গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে বরিশালে। ডিবিসি’র দুপর ১২টার নিউজে অপূর্ব অপুর লাইভ-এ জানলাম, এধরনের আয়োজন ৪৪ বছরের ইতিহাসে বরিশালে এবারই প্রথম। এদিকে আমার ধারণা, এ ধরণের আয়োজন এর আগে বরিশালে তো দূরের কথা, দেশের কোথাও হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। এবং আমি নিশ্চিত, বরিশালে গতকালের এই আয়োজন পচাত্তরের থিংকট্যাক-এর পায়ের নীচের মাটিতে বড় ধরনের কম্পন ধরিয়েছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড চালানো হয়েছে। এটি হয়েছে পরিকল্পিত এবং নির্ভুল ব্লুপ্রিন্ট অনুসারে। কিন্তু এমন একটি কৌশলী প্রচারণার আশ্রয় নেয়া হয়েছে, কতিপয় সামরিক অফিসার মাথা গরম করে কান্ডটি ঘটিয়ে ফেলেছেন এবং তার পর পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য নিরুপায় হয়েই বিষয়টি হজম করেছেন তৎকারীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সামরিক কর্মকর্তারা। কিন্তু বাস্তবতা মোটেই এমন নয়। বরং পরিকল্পিভাবে জাতির পিতাকে হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরী করা হয়েছে। ১৫ আগস্টের নিখুঁত পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং হত্যাকান্ডের পর করনীয়ও আগেভাবে নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। মোদ্ধাকথা, পুরো বিষয়ের পিছনে পচাত্তরের থিংকট্যাংক নিপুনভাবে কাজ করেছে। যে বিষয়ে আমার প্রাথমিক ধারণা ১৯৮০-৮১ সালের দিকে সাপ্তাহিত জনকথায় কাজ করার সুবাদে। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ছাত্র রাজনীতিতে বেশ সক্রিয়।

পরবর্তীতে পেশাগত কারণে অধিকতর জেনেছি, ১৫ আগস্টেরর নেপথ্যের নানান ঘটনা। এ সময় কর্নেল ফারুক ও মেজর শাহরিয়ারের মুখেও নানান ঘটনার বিষয়ে শুনেছি। সাংবাদিক হিসেবে আমিই প্রথম গণমাধ্যমে বিস্তারিত তুলে ধরেছি, ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের শিকার আবুল হাসানাতের পরিবারের কথা। বিষয়টি পাঠকদের বিস্তারিত জানিয়েছি, শাহানারা আবদুল্লাহ শানুর সাক্ষাৎকার আকারে। তখন আমি সাপ্তাহিক সুগন্ধার ভারপ্রাপ্তা সম্পাদক কাম রির্পোটার। শাহানারা আবদুল্লাহ শানুর বক্তব্য আমি প্রথম টেলিভিশনে প্রচার করার ব্যবস্থা করেছি বাংলাভিশনের মাধ্যমে। তখন আমি বাংলাভিশনের কান্ট্রিএডিটর, জেলা ডেক্সের প্রধান।

ঘটনাচক্রে ১৫ আগস্টের বিষয়ে মূল সূত্র পাবার কারণে এ বিষয়ে এক ধরনের গভীর বোধ সৃষ্টি হয়েছে আমার। ফলে অনেক আগে থেকেই বুঝতে পেরেছি, জাতির পিতাকে হত্যা করা হঠাৎ কোন ঘটনা নয়। ইতিহাস বলে, ১৯৭৫ সালে যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে তারা ৭২-৭৩ এটি করার সাহস পেতো না। এ জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকেই। এদিকে সরকারের মধ্যেই সরকারের শত্রু লুকিয়ে ছিলো। এদের প্রভাবে তাজউদ্দিন আহমদ বরখাস্ত হলেন, প্রভাব বাড়লো আমেরিকার এজন্টে হিসেবে পরিচিত খন্দকার মোশতাকের। নানান ভাবে সম্মিলতভাবে ট্রাজিক ঘটনা ঘটানোর প্রেক্ষাপত তৈরী করা হয়েছে। এ মূল্যায় প্রবীন রাজনীতিক হায়দার আকবর খান রনোর। তার মতে ক্ষেত্র প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে জাসদ, ভাসানী ন্যাপসহ বিভিন্ন বাম ধারা সহায়ক ছিলো। হায়দার আকবর খান রনো আমার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকতারে সরল স্বীকারুক্তি করেছেন, ‘ক্ষেত্র প্রস্তুতের ধারায় আমি নিজেও পড়ি!’

কেবল কেন্দ্র কেন্দ্রিক ছিলো না ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্র। গ্রাসরুটেও ষড়যন্ত্রের শক্ত নেটওয়ার্ক ছিলো। এর প্রমান মেলে বরিশালেই। ইতিহাসের ঘৃন্যতম ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের দেড় ঘন্টার মধ্যেই কাকডাকা ভোরে বরিশাল শহরে ‘আনন্দ মিছিল’ বের হয়েছিলো। সেদিন একই রকম ‘আনন্দ মিছিল’ হয়েছিলো বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ সদরে এবং পটুয়াখালী শহরসহ অরো অনেক এলাকায়। এ থেকে প্রমানিত হয়, ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্রের খলনায়করা গ্রাসরুট পর্যায়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলো।

এই ধারার বিপরিতে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ চেষ্টাও হয়েছে বরিশার-পটুয়াখলী-বরগুণাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এমনকি প্রতিরোধ যুদ্ধও হয়েছে। কিন্তু পচাত্তরের থিকংট্যাকেং-এর পরিকল্পনা এতোটাই নিখুঁত ছিলো যে বহু বছর দেশের মানুষ জেনেছে, বঙ্গবন্ধু হত্যার কোন প্রতিবাদই হয়নি। এই ধারনা সৃষ্টি করা হয়েছে নানান কৌশলে।

এই কৌশলের কারণেই মাওলানা ভাসানী মোশতাক সরকারকে ‘দোয় করেন।’ অথচ স্বাভাবিক ছিলো, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিরুদ্ধে ‘খামোশ’ বলে রুখে দাড়াবেন মাওলানা ভাষানী। যা তিনি কারণে অকারণে বহুবার করেছেন। কিন্তু এমনটা ঘটেনি ১৫ আগস্টের বিরুদ্ধে। ঘটেছে উল্টোটা। ১৫ আগস্ট দুপুরে টাঙ্গাইল থেকে টেলিগ্রামে খুনী খন্দকার মুশতাককে স্বীকৃতিসহ দোয়া পাঠান মাওলানা ভাষানী। এরপর ১৭ আগস্ট সকালে মোশতাক টাঙ্গাইলের সন্তোষে পাঠান মন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর ও শাহমোয়াজ্জেম হোসেনকে। সে সময় ভাসানীর বাসগৃহে ঢাকা থেকে নানা পদ পদবীর দেশী-বিদেশীরা যাচ্ছেন-আসছেন। মাওলানা ভাষানীর ধারায় যুক্ত হন আরো অনেক রাজনীতিক।

কেবল রাজনীতিকরা আর সামরিক ব্যক্তিত্ব নয়, শিল্পী ও সংবাদ পত্রও সরব করা হলো খুনি মোশতাকের পক্ষে। পটভূমি তৈরীতেও ভুমিকা ছিলো তাদের। ১৯৭৫এর ১৫ আগষ্ট দুপুরে ঢাকা বেতারে বীরদর্পে ঢুকলেন খান আতাউর রহমান। হারমোনিয়াম তবলা নিয়ে বসে গেলেন। খান আতাউর রহমান রচনা করলেন “এদেশ ধ্বংস হলো কাহাদের জন্য…।” পুরুষ ও নারী কন্ঠের দুজন বেশ দ্রুত সুর তুলে লাইভ গাইলেন। এরপর ক্রমাগত রেকর্ড গানটি বাজতে থাকে এরপরই রচিত হলো আরেকটি গান, ‘অলিআল্লাহর বাংলাদেশ. পীরমুর্শিদের বাংলাদেশ ..’ গানটি। খান আতা প্রতি রাতে ঢাকা বেতার থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গীতিনাট্য প্রচার করতেন। নির্ধারিত গায়ক-গায়িকা ছিল লাভলী ইয়াসমীন, মিলি জেসমিন ও নাজমুল হুদা। খান আতা ১৯৭৬ সালে সরকারি অর্থে নির্মাণ করলেন প্রামাণ্যচিত্র “ওয়াটার অব গ্যাঞ্জেস”। ভারত ও শেখ মুজিব শাসনবিরোধী আধা ঘন্টার চিত্রটি টিভি ও সিনেমা হলে প্রদর্শন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে মানুষের মন বিষিয়ে তোলার ব্যবস্থা করা হলো।

ইত্তেফাক বাসন্তীর জাল পরা ‘জাল ছবি’ ছেপেছিলো ৭৪ সালে। ইত্তেফাকের ফটো সাংবাদিক আফতাবের ক্যামেরায় পোজ দেয়া জালপরা ছবিটির ‘মডেল’ গরীব বাসন্তী পেয়েছিলো পঞ্চাশ টাকা। কিন্তু বিলিয়ন ডলার সর্বনাশ হলো বঙ্গবন্ধু সরকারের। বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমি নির্মাণে দৈনিক ইত্তেফাকের অই ছবিটি অকল্পনীয় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন গবেষকরা। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর ২৮ আগস্ট ইত্তেফাকে মানিক মিয়া পুত্র আনোয়ার হোসেন স্বনামে লিখলেন “মারহাবা সোবহানাল্লাহ” গোছের আর্টিকেল। তিনি লিখলেন, ‘বাঙ্গালী জাতি নব পর্যায়ে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের একটা সুযোগ লাভ করিয়াছে।’

গভীরভাবে একটু চিন্তা করলেই বুঝাযাবে, পচাত্তরের থিংকট্যাংকের পরিকল্পনা কতটা সর্বগ্রাসী ছিলো। এর বিপরিত ধারা ছিলো খুবই সাধারণ। বাঘের হুকংকারে বিরীতে বিড়ালের মিউমিইর মতো! যদিও ২০০৮ সার থেকে এ ধারারার অনেক পরির্তন হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। এই ধারায় গতকাল শনিবার বরিশাল জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান আয়োজনে ১৫ আগস্টের প্রত্যদর্শীদের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করেন অনেকে। এ বিশ্বাসের সঙ্গে আমি একমত।

লেখাটি শেষ করার আগে, আমার একধরণের অতৃপ্তির কথা উল্লেখ করতে চাই। তা হচ্ছে, জীবিকার প্রয়োজনে আমাকে শুক্রবার রাতে বরিশাল ছেড়ে ঢাকা আসতে হয়েছে। যে কারণে কেবল বরিশাল নয়, বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হতে পারলাম না, অল্পের জন্য। দৈনিক দখিনের সময়-এর প্রকাশক, সম্পর্কে আমার বড় ভাই, খন্দকার রফিকুল ইসলাম কি ভেবেই যেনো শুক্রবারে পরির্তে শনিবার ঢাকার পথ ধরতে বলেছিলেন। এ কথা তিনি একাধিকবার বলেছেন। কিন্তু জীবিকা প্রশ্নে ঝুকি নেইনি। তখন অমি শনিবারের আয়োজন সম্পর্কে জানতাম না। এই অজ্ঞতার কারণে পেশাগত এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি ও বিশ্বাস প্রশ্নে অপুরনীয় ক্ষতি হলো অমার। নিশ্চিভাবে বলতে পারি, সাংবাদিকতা জীবনে এর চেয়ে বড় মিস আমার আর ঘটেনি, এখন পর্যন্ত। উল্লেখিত ইভেন্ট সম্পর্কে জানলে নিশ্চয়ই আমি জীবিকার চাপ উপেক্ষা করতাম। শুক্রবার ঢাকা আসতাম না। ইভেনটি কাভার কলে শনিবার রাতে ঢাকা যাত্রা করতে পারতাম। উল্লেখ্য, চাপ উপেক্ষা করার এক ধরণের ইনবিল্ড প্রবনতা আমার আছে।
আলম রায়হান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক


রিয়াজ পাটওয়ারী

প্রধান ‍উপদেষ্টা: মো: ‍আবু তালেব মিয়া
প্রকাশক: মো: ‍ইনাম মাহমুদ
সম্পাদক : রিয়াজ পাটওয়ারী
যুগ্ম সম্পাদক: খান আব্বাস
প্রধান সম্পাদক: মো: কামরুল ইসলাম
সহ সম্পাদক: শরিফুল আলম সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক: শাহাদাত তালুকদার
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এম এইচ প্রিন্স
Desing & Developed BY Engineer BD Network