ঢাকা,
মেনু |||

সন্তানের ইচ্ছেগুলোকে দাম দিতে শিখুন

দীর্ঘ বছর একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াতাম ।সম্প্রতি পড়ানোর কাজটা ছেড়ে দিয়েছি। শিক্ষকতা পেশা ছাড়তে তেমন কষ্ট হয়নি সেটা বলবো না তবে লেখালেখি আর আবৃত্তিটা চালিয়ে যাবার জন্য ভোর ৭টা থেকে বিকেল ৪টা অবধি বাচ্চাদের সাথে হাউকাউ, গাদা গাদা কপি চেকিং, স্কুলের কিছু মানুষের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে বই মুখস্থ করা ক্ষমতার অপরাজনীতি, এসবের পর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে লেখারা ঠিক মাথা থেকে আর বেরোতে চাইতো না।

 

 

লিখতে গেলে লাগে মুক্ত মন স্বাধীন চেতনা আর লাগে আকাশের মত উদার পরিবেশ। তাই একটা সুস্থ-সুন্দর সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। যে কোনো প্রতিষ্ঠানে লম্বা সময় ধরে কাজ করতে করতে সেই জায়গাটার প্রতি মায়া জন্মে যায়, কিছুটা অধিকার ও তৈরি হয় বটে, আর যাদের সাথে কাজ করা হয় তারা তো অনেকটা পরিবারের মতোই আপন হয়ে যায়। তাই ছেড়ে আসা টা ছিল সত্যি খানিকটা বেদনার। কিন্তু বিশ্বাস করুন, কিছু ছেড়ে আসাও যে আনন্দের সেদিন তা টের পেয়েছিলাম। শুধু মনটা কেঁদেছিল ঐ নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোর জন্য। ওরা তো আমাদের নিজেদেরই সন্তানসম। হয়ত মালিক প্রতিষ্ঠানটা পরিচালনা করেন কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের নিজ হাতে ভেঙে –চুড়ে আমরাই গড়ি। ওরা আমাদেরই কষ্ট এবং ভালবাসায় গড়া আগামী প্রজন্ম। এমনকি ওরা নিজেদের –মা-বাবার চেয়েও শিক্ষকদের কথা অনেক বেশি মূল্যায়ন করে কখনো কখনো।

এবার আসি আমার গল্পের শিরোনামে।

দেখুন মা-বাবা সন্তান জন্ম দেন তাদের চাহিদা এবং প্রয়োজনে। হয়তো বলবেন কিসের প্রয়োজন? হ্যাঁ, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনে। একটা সময় মা –বাবা বৃদ্ধ হয়ে গেলে কে দেখবে? ঐ ছেলেমেয়েই হবে শেষ ভরসা, তাছাড়া এত এত অর্থ –সম্পদ এসব ভোগ-দখলের জন্যও তো উত্তরসূরি লাগে, তাই না? মধ্যযুগে তো কোনো স্ত্রীর সন্তান না হলে শ্বশুর –শাশুড়ি ছেলেকে আবার বিয়ে দিতেন। সন্তান না হওয়া নারীকে বন্ধ্যা অপবাদ দেয়া হতো, দেয়া হতো তালাক পর্যন্ত। কাজেই সন্তান, মা-বাবা এবং একটা পরিবারে কতটা প্রয়োজন এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই পরিবার, আত্মীয় – স্বজন, বন্ধুবান্ধব এমনকি প্রতিবেশীরা পর্যন্ত সমালোচনা শুরু করে দিবে। কেন আপনার বাচ্চা হচ্ছে না কিম্বা কেন বাচ্চা নিচ্ছেন না।

 

 

তাহলে কি আপনাদের দু’জনার মধ্যে কারো কোনো সমস্যা? চারপাশ থেকে অনেক রকম জ্ঞান আসতে থাকবে। এই যেমন ধরুন, আরেহ বাচ্চা নিয়ে নাও। ক’দিন পর তো হাজবেন্ড অন্য মেয়ের কাছে যাবে -পরকীয়া করবে, তখন কি করবে? আবার একটা বাচ্চা হলে বলবে ,আল্লাহ একটা বাচ্চার কোনো ভরসা আছে নাকি, আরেকটা বাচ্চা নিচ্ছো না কেন? তাহলে দু’টো বাচ্চাকে এক সাথে স্কুলে দিয়ে মানুষ করতে পারবে। বেশি দেরি করলে দেখবে আর বাচ্চাই হচ্ছে না। এমন অসংখ্য মর্মহীন কথার তীর ছোঁড়া হবে আপনার দিকে।

 

 

 

কিন্তু সন্তান পৃথিবীতে নিয়ে আসার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা বা ইচ্ছে একজন মা এবং বাবার। কত মানুষ বিধাতার কাছে প্রার্থনা করেও একটা দেবশিশুর আগমন ঘটাতে পারছেনা এই ধরণীতে, আবার কত কত অনাকাঙ্ক্ষিত মানব ভ্রূণ পড়ে থাকে ময়লা ডাস্টবিনে। সবই আসলে ওপরওয়ালার ইচ্ছা। মা-বাবার সাথে সন্তানের সম্পর্ক বোধহয় রক্ত এবং নাড়ির টানে পৃথিবীর অন্য সম্পর্কগুলোর চেয়ে একটু আলাদা হয়। সন্তানের কিছু একটা হলে বাবা-মায়েদের খুব কষ্ট হয় আবার মা-বাবার ক্ষেত্রেও আদর্শ সন্তানেরও ঠিক তাই। পৃথিবীর যে কোনো সম্পর্কের সাথেই এই সম্পর্কের তুলনা অতি তুচ্ছ –নগণ্য। কথায় বলে, সন্তানের লাশ নাকি বাবার কাঁধে সব থেকে ভারী। কিন্তু বিধাতার চাওয়া এবং পরিকল্পনার কাছে কখনো কখনো হেরে যেতে হয় সেই অপ্রতীম মা- বাবাকেও। অসহনীয় যন্ত্রণায় বুকে পাথর চেপে কাঁধে তুলে নিতে হয় প্রাণপ্রিয় সন্তানের প্রাণহীন কফিন।

 

 

 

শুরুতেই আমি আমার স্কুলের কথা বলেছি। অসম্ভব কষ্ট হয়েছিল অতগুলো সন্তানকে এক সাথে ছেড়ে আসতে। ছাত্র-ছাত্রীরা তো সন্তানেরই মতো। প্রথম দিকে অনেক রাত ঘুমোতে পারিনি। ওদের মিষ্টি মিষ্টি কথা , নিষ্পাপ হাসি, ওদের দুরন্তপনা ,ক্লাসে ওদের সাথে চরম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আমাকে ভীষণ পীড়া দিতো। ওদের দেয়া ছোট ছোট হাতের ফুল পাখি ছবি আঁকাগুলো দেখেছি আর নীরবে কান্নাটাকে বুকের ভেতর চেপে রেখেছি। আমার পরিবারের লোকজন বলতো শুধুমাত্র এই বাচ্চাগুলোর জন্যই নাকি আমি চাকরিটা ছাড়তে পারবো না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে,তাই সেদিন ছেড়ে চলে এসেছিলাম ওমন কচি কচি মুখগুলো। স্কুলের প্রিন্সিপাল প্রায়ই ফোন করে বলেন, সময় করে এসো।বাচ্চাদের দেখে যেও। কথা দিয়েছিলাম আসবো ।

 

 

 

হঠাৎ সেদিন একটা ফোন এলো ।আমাকে বলা হলো, মিস আপনি কষ্ট পাবেন জানি কিন্তু খবরটা আপনার জানা দরকার । বুকের ভেতরটা কেমন হূ হূ করে উঠলো ! কি হয়েছে ? জানতে চাইলাম । খবর পেলাম আমি যে ব্যাচে পর পর দু’দুবার ক্লাস টিচার ছিলাম সেই ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী, সবচেয়ে নম্র –ভদ্র –শান্ত ছেলেটি সুইসাইড(আত্মহত্যা) করেছে। আমি খুব অশান্ত হয়ে পড়লাম । মানতেই পারছিলাম না ঐটুকু বাচ্চা ছেলে কি এমন রাগ বা অভিমান হলো যে আত্মহত্যার মত কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারলো ? শুধু এইটুকু জানলাম , ও ঐ দিন খুব স্বাভাবিকই ছিলো । মায়ের সাথে ব্রেকফাস্টও(সকালের নাস্তা) করেছিলো ,এমনকি সকালের দিকে অনলাইন ক্লাসও । অথচ কি এমন ঘটলো যে ঘরে ফিরে মা-বাবা কে দেখতে হলো ১৫ বছরের একমাত্র ছেলে ,মায়েরই ওড়না পেঁচিয়ে সিলিং ফ্যানে ঝুলন্ত নিষ্প্রাণ –নিথর দেহ ।ভাবা যায় কেমন করে বেঁচে থাকবেন ওর মা-বাবা !

 

 

 

একজন শিক্ষক হিসেবে খুব কাছ থেকে দেখেছি ,শান্ত –ধীর স্থির মেধাবী একটা বাচ্চা । প্রতি বার হাসি মুখে ওর রিপোর্ট কার্ড নিয়ে স্কুল ছাড়তো ওর মা –বাবা । অসম্ভব বিনয়ী ওমন মা-বাবা কে দেখলেই বোঝা যায় কেন তাদের সন্তান এতটা ভদ্র ! টিচার হিসেবে আমি নিজেই ব্যথায় কাতর ।লিখতে গিয়ে হাত কাঁপছে ,বাচ্চাটার মুখটা মনে পড়তেই চোখ ভিজে আসছে ।তাহলে কেমন করে একমাত্র সন্তান হারিয়ে মা-বাবা অসহনীয় যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে পার করবেন আমৃত্যু প্রতিটি মুহূর্ত ??বিধাতা ওদের শক্তি দিন এ কঠিন শোক কাটিয়ে ওঠার ।

 

 

 

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বলেছেন , “ নারীর কাছে সন্তান প্রসব একটা তৃপ্তিকর শান্তি “।কি নিদারুণ শান্তিই না সেদিন হয়েছিল আমার ছাত্রের মায়ের ,যেদিন প্রথম স্নিগ্ধ ফুটফুটে ঐ মুখটা দেখেছিল । তাই বুঝি আজ সবটুকু শান্তি নিয়ে অবুঝ ছেলে মাকে ভাসিয়ে গেলো বেদনার এক নীল সাগরে !

 

 

 

আমাদের ব্যর্থতা আসলে কোথায় ? মা-বাবা হিসেবে আমরা সন্তানকে বুঝতে পারছি না নাকি সন্তান হয়ে ওরাও একটু বেশি মাত্রায় দাবি–দাওয়া করে ফেলছে, কোনটা ? কিন্তু একজন টিচার হিসেবে আমি যতটা জানি ওর মতো বিনয়ী অমায়িক মেধাবী ছেলে খুব কম মানুষেরই হয় । ওর সমস্যা ছিলো ও কারো সাথে মিশতে চাইতো না, খেলতে চাইতো না এমনকি বন্ধুদের সাথে আড্ডাতেও কমই দেখা যেত । সব সময় পড়াতেই ওর মনোযোগ ছিলো । একবার রিপোর্ট কার্ড নিতে এসে ওর মা আমাকে বললেন ,মিস আমার ছেলে খুব ভালো গান গায় । ওকে দিয়ে কোনো অনুষ্ঠানে গান গাওয়াবেন প্লিজ ,আমি আপনাকে অনুমতি দিয়ে গেলাম । পাশে বসে বাচ্চাটা হাসছিলো আর মাথা ঝাঁকিয়ে না মিস না মিস বলছিলো ।

 

 

 

বুঝতে পারলাম ওর মন এতে সায় দিচ্ছে না । বাদ দিয়ে দেয়া হলো ।কিন্তু এই তো মাত্র ক’মাস আগে একটা ডিবেট প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে বেশ ভালো বক্তব্য রাখলো “ মোবাইল ফোনের ব্যবহার এবং অপব্যবহার “ভিত্তিক বিষয়ে ।এর মানে টা কি দাঁড়াচ্ছে ও যা চায় তা ও মন দিয়ে করে এবং ভালো ফলাফলও আসে । ওর বন্ধুদের সাথে কথা বলে যতটা জেনেছি ,ও চায়নি এই স্কুলে আর থাকতে । এর একমাত্র কারণ ওর সমকক্ষ মেধাবী সব বন্ধুরা স্কুলটা ছেড়ে দিয়েছে । তাই ও কিছুটা একা হয়ে যায়। কিন্তু এটা তো কোন ডিপ্রেশন বা হতাশার কারণ হতে পারেনা যার জন্য মা-বাবা কে এত বড় শাস্তি পেতে হতে পারে ! তাহলে কি মা-বাবা হিসেবে সন্তানদের সাথে আমাদের সম্পর্ক আরও সহজ এবং সাবলীল হতে হবে ?যাতে করে একে অপরের ভাষা থেকে শুরু করে চাওয়া পাওয়ার জায়গায় একটা অন্ত্যমিল থাকে ।যে মিলের মাঝে কোনো দেয়াল বা অস্পটতা বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায় ।

 

 

 

এমন অনেক অভিভাবক আছেন যারা নিজের ছেলেমেয়েকে বুঝতেই চেষ্টা করেন না। অনেক বাবা আছেন যারা ভাবেন সংসারে অর্থ উপার্জনটাই পুরুষ মানুষ বা অভিভাবক হিসেবে একমাত্র কর্তব্য । ছেলেমেয়ে কে কোন ক্লাসে পড়ে, কে কি পোশাক পড়তে পছন্দ করে ,কি খেতে ভালোবাসে ,তারা কাদের সাথে মেলামেশা করে বা কোথায় বাবার সাথে একদিন একটু সময় কাটাতে চায় এটা তাদের ভাবনাতেই আসে না। এক্ষেত্রেও সন্তানের সাথে সেইসব বাবাদের একটা দূরত্ব তৈরি হয় ।আবার এমন অনেক বাবা –মা আছেন যারা ছেলেমেয়ে না চাইতেই অনেক কিছু দিয়ে ফেলেন । একটা জিনিস কষ্ট করে অর্জন করার বা পাওয়ার যে আনন্দ সেটা না চাইতেই যারা পেয়ে যায় , অভাববোধটা অনুভব করতে পারে না সে সব ছেলেমেয়েরা খুব সহজেই যে কোন অপরাধ মূলক কাজে লিপ্ত হতে পারে । এটা ঐ সকল পয়সাওয়ালা বাবা-মায়েদের বোঝা উচিৎ । আমাদের সমাজে এরকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে । যা লিখে শেষ করা যাবেনা। ঐশীর কথা নিশ্চয়ই আমরা কেউ ভুলে যাইনি ।ভুলে যাইনি বাইক কিনতে না পারার কষ্টে পিতাকে জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারার কথা । আসলে মা -বাবা কে দোষারোপ করে কি লাভ বলুন ? সব বাবা মাই চান তার সন্তান থাকুক দুধে ভাতে ।

 

 

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বলতে চাই, কিছু কিছু অভিভাবক আছেন যারা কথা ফোটার আগেই বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন । কারণ, হয় মায়েদের ব্যস্ততা নয় বাচ্চার মানসিক সমস্যা । বাংলাদেশে এমনও কিছু স্কুল আছে যেখানে সন্তান পেটে থাকতেই সেই স্কুলের ফর্ম তুলে রাখতে হয় ,এতটাই নাকি সেখানে আসন ডিমান্ড এবং আসন সংকট । ভাবুন তারা কোন পর্যায়ের সচেতন মা-বাবা ! কিছুদিন যেতে না যেতেই একরত্তি বাচ্চার কাছে মায়েরা বেশ কিছু দাবি–দাওয়া করে বসেন । এই যেমন –বাসায় কোনো অতিথি এলেই বাচ্চাকে ডেকে বলে, বাবা ঐ রাইমস টা আন্টিকে শোনাও তো ,আচ্ছা সেদিন তুমি নতুন যে গানটা তুললে একটু গেয়ে শোনাও না বাবা । জানি, সন্তানের যেকোন সাফল্যই মা-বাবার আনন্দের ব্যঞ্জন । তাই বলে আমার বাচ্চার সাইকোলজি বা মানসিক অবস্থা না বুঝেই অপরিচিত কারো সামনে গাইতে- নাচতে- কবিতা পড়তে বলাটা আদৌ আমার বাচ্চা পছন্দ করছে কিনা সেদিকটায় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। বাসায় মেহমান এলে ছোট বাচ্চাকে দিয়ে আতিথিয়তা করাতে শেখাতে হবে।পাশের রুমে দরোজা লাগিয়ে ছেলে মেয়ে পড়বে বা গেমস খেলবে অথচ ঘরে অতিথি এলে দেখা করে সামান্য সৌজন্যটুকু দেখাবে না এটা কিন্তু এক ধরণের অসামাজিকতা কাজেই এইটুকু ভদ্রতা অভিভাবককেই শেখাতে হবে।

 

 

 

 

সন্তান একটু বড় হতে না হতেই মায়েদের চাওয়াটা যেন আরো বেড়ে যায় । কেন পরীক্ষায় প্রথম হলো না, কেন এত পড়িয়েও দুটো অঙ্ক ভুল হলো এভাবে বাচ্চাদের উপর চলে মানসিক অত্যাচার । এমনকি ঐ সব ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মায়েরাই একদিন হয়ে যান পুরো বাণিজ্যিক । স্কুল টু কোচিং ,কোচিং টু প্রাইভেট এবং প্রাইভেট টু হোম ওয়ার্ক । সত্যি বলতে কি এসব মায়েরা পারিবারিক সম্পর্কগুলোও ভুলে যান সন্তানদের লেখাপড়ার পেছনে অতিমাত্রায় সময় দিতে গিয়ে । এমন অনেক মাকে দেখেছি বাবা-মা ভাই বোনের খবর নেবার সময় পান না বলে ট্রাফিক জ্যামে বসে মোবাইল ফোনে খোঁজ খবর নেন । নাগরিক জীবনে এমন অনেক একক পরিবার কে খুব কাছ থেকে দেখেছি, ছেলে-মেয়ের পরীক্ষার সময় সেই বাড়িতে আত্মীয়–স্বজনের অসুখ-বিসুখ হলেও ডাক্তার দেখাতে আসা বারণ । কারণ তাতে ছেলেমেয়ের পড়াশুনার ক্ষতি হতে পারে ।কোথায় হারাচ্ছে পারিবারিক মূল্যবোধ । তাহলে কি শিখবে আমার –আপনার সন্তান ?

 

 

 

আমি এমন কিছু অভিভাবক কে দেখেছি আমার শিক্ষকতা জীবনে যা সত্যি খুব মর্মাহত করে । খুব মেধাবী আর খুব পড়ুয়া এই দু’টোর ব্যবধান অনেক মা-বাবা বুঝতে চেষ্টা করেন না। একটা সামান্য ভুলভ্রান্তি হলে যেখানে ০.৫ তো দূরের কথা ০.১ নিয়েও প্রিন্সিপাল পর্যন্ত দৌড়াতে হয়েছে টিচারদের , কোনো কোনো অস্বাভাবিক মাত্রায় সচেতন অভিভাবকের জন্য । এটাকে আসলে সচেতনতা না বলে আদিখ্যেতা বলাই বোধহয় ভালো । এসব মায়েরা আসলে কি চান তাদের সন্তানদের কাছে তা তারা নিজেরাই জানেন না। বিন্দুমাত্র স্পেস তারা বাচ্চাদের দিতে চান না। পড়ালেখার বাইরেও যে একটা মুক্ত আলোকিত সুন্দর জীবন আছে এসব মা-বাবারা তা ভুলেই গেছেন অসুস্থ প্রতিযোগিতার পেছনে দৌঁড়িয়ে । বই মুখস্থ করে কি জীবনবোধ শেখা যা নাকি জানা যায় জীবনের হিসাব –নিকাষ কোনটা? জগতটাকে জানতে হলে সবার আগে মানুষকে জানতে হবে , মানুষকে ভালবাসতে হবে ,হতে হবে মানবিক । বই পড়ে বড় বড় সার্টিফিকেট অর্জন করলেই কি বড় মানুষ হওয়া যায় ? আদর্শ মানুষ হতে হলে লাগে সামাজিক জ্ঞান পারিবারিক মূল্যবোধ ।

 

 

 

আজকালকার মা –বাবারা শুধু ছেলেমেয়ের প্রথম হওয়া দেখতে চায় । কিন্তু সন্দেহ হয় ,ক’জন মা বাবা সন্তানকে বলেন যে , এক রোল নয় আমি তোমাকে এক নম্বর ভালো মানুষ হিসেবে দেখতে চাই । অন্যের ছেলে মেয়ে কে কি করলো কত বড় ডাক্তার -ইঞ্জিনিয়ার হলো এসব তুলনা করে নিজের সন্তানকে মানসিক ভাবে হেয় করবেন না। তুলনা জিনিসটা ভীষণ খারাপ । এতে হিতে বিপরীতটাই বেশি হয়। অন্যের কাছে নিজের সন্তানকে তার নিজস্ব গুণাবলীর প্রশংসা করুন । দেখবেন ওরা খুব ভালো উৎসাহ পাবে । আর ভালো কথা এবং উৎসাহ যেকোনো কাজের জন্য সুফল বয়ে আনে । আর একটা কথা, বাচ্চাদের কে একটু বুঝতে শিখুন । একদম জোরাজুরি বা চাপাচাপি নয়-ওদের কাঁধ থেকে বই নামক ভয়ঙ্কর বস্তুর ভারী বোঝাটা একটু হালকা করুন। ( আমি বলবো এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেও একটা বড় ভূমিকা রয়েছে ) । ওদের যা করতে ভালো লাগে, যেখানে যেতে মন চায় আপনার সাধ্য এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ততটুকু করতে সাহায্য করুন । দেখবেন সেই বাবা মা হিসেবে আপনি কতটা সুখ বোধ করছেন আর এতে করে আপনার সন্তানও আপনাকে সম্মান করতে কার্পণ্য করবে না।

 

 

 

আজকাল শুধু নাগরিক জীবনে নয় গ্রামেগঞ্জেও মুরব্বীদের খুব এক পেশে করে রাখা হয় । বয়স্ক মানুষগুলো যেনো সংসারে অনেকটা অকেজো অনাহূত প্রাণী। কিন্তু এরাই যে আমাদের মূল শেকড় সে কথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বোঝানোর দায়িত্বটা কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আমার –অপনার । নানা-নানী ,দাদা-দাদী এদের সাথে নিজের সন্তানের সুসম্পর্ক করে উঠতে দিন । জীবনের সার কথা তো তাঁদের থেকেই শিখবে ওরা। অথচ কি আধুনিক আর বেপরোয়া আমরা ,শুধুমাত্র ছেলে-মেয়ের সুখ-শান্তির কথা ভেবে নিজের জন্মদাতা মা-বাবাকে পাঠিয়ে দেই বৃদ্ধাশ্রমে । এ পরাজয় সমাজে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে বৈ কমাচ্ছে না । আজকালকার আধুনিক যুগের ছেলেমেয়েরা তো চাইবেই পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানান রকম সংস্কৃতির সান্নিধ্যে যেতে । এটার মন্দভালো দুটো দিকই আছে । ভালোটা গ্রহণ করতে হলে আগে জানতে হবে নিজেকে ,নিজের দেশ-সংস্কৃতিকে। প্রচুর বই পড়তে হবে ।গল্প-কবিতা – সাহিত্য -উপন্যাস এসবের ভেতর দিয়েই তো ছেমেলেয়েরা আবিষ্কার করবে নিজস্ব অস্তিত্ব ।

 

 

 

আমি-আপনি –আমরা যা হতে চেয়েছিলাম সুযোগ অথবা সামর্থ্যের কারণে তা হয়ত হয়ে উঠা হয়নি । আমার-আপনার অতৃপ্ত বাসনা পূরণের সুপ্ত ইচ্ছেগুলোর দ্বায় সন্তানের উপর চাপাতে পারিনা । এ ভারী অন্যায়।বিধাতা সবাই কে মেধা-মনন বোধ দিয়েছেন । এসব তাকে তার মত করে ব্যবহার করতে দিন । আজকাল আমরা খবরের কাগজ কিম্বা টেলিভিশন খুললেই অনেক প্রতিভার চমক দেখতে পাই । যে ছেলে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই সুযোগ পায়নি সেই ছেলেটাই ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়ে আজ বিসিএস ক্যাডার ।যে মেয়েটা বুয়েট থেকে ভাল রেজাল্ট করে বেড়িয়েছি সে আজ খাবার বিক্রি করে কোটিপতি । এমন ব্যতিক্রম সফলতার জন্য সাধুবাদ জানাবো ঐ সকল অভিভাবক কে যারা সন্তানের এমন সাহসী উদ্যোগের পাশে ছিলেন । সব মা-বাবাই যে উদারতা দেখিয়েছেন তা কিন্তু নয় বরং অনেক প্রতিকূলতা এসব সফলদের পাড়ি দিতে হয়েছে তাই আজ ওরা সমাজের সফল উদাহরণ । লেখাপড়া অবধারিত কিন্তু সব লেখাপড়াই যে জীবনে সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্য বয়ে আনবে তা কিন্তু নয় । বিদ্যাবুদ্ধি আর শিক্ষাই যদি সকল সফলতার চাবিকাঠি হতো তাহলে পৃথিবীতে অনেক অশিক্ষিত মানুষ না খেয়ে মরতো।

 

 

 

মায়েদের কে বলবো ,আপনার সন্তানের হাত –পা ছেড়ে দিন । নিজের মতো চলতে শিখুক ।তাই যদি না হবে তবে কি দরকার ছিল শিশুকালে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে দাঁড়াতে শেখার ? এমন ভাবে সন্তানকে স্বনির্ভর করে তুলুন যেন যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা সে নিজেই করতে পারে ,জীবনের কাছে হেরে যেতে না হয় ।

 

 

 

টমাস আটওয়া বলেছেন, আমি চির বিদায় নিচ্ছি না , আমার সন্তানের মধ্যে আমি বেঁচে থাকবো বহুদিন “।কিন্তু যে প্রিয় সন্তানেরা এভাবে অবুঝের মতো অনেকটা স্বার্থপরের মতো শুধু আবেগ আর ইগো কে প্রাধান্য দিয়ে ছেড়ে চলে যায় মা-বাবা কে সেই সকল মা-বাবা তবে নিজেকে কার ভেতর বাঁচিয়ে রাখবেন ?

 

 

 

এমন অপ্রত্যাশিত চলে যাওয়া যেন আর কারো দেখতে না হয় । আমরা তেমন বন্ধুত্বই গড়ে তুলবো নিজের সন্তানদের সাথে। রাগ নয় ,অপমান নয় ,নয় নিরাশা-হতাশার কথা ।কেবলই শোনাবো স্বপ্নের কথা ,সম্ভাবনার কথা।দাম দিতে শিখবো আমার সন্তানের ইচ্ছেগুলোকে।


akash bangla

প্রধান ‍উপদেষ্টা: মো: ‍আবু তালেব মিয়া
প্রকাশক: মো: ‍ইনাম মাহমুদ
সম্পাদক : রিয়াজ পাটওয়ারী
যুগ্ম সম্পাদক: খান আব্বাস
প্রধান সম্পাদক: মো: কামরুল ইসলাম
সহ সম্পাদক: মো: মেহেদী হাসান
নির্বাহী সম্পাদক: শাহাদাত তালুকদার
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এম এইচ প্রিন্স
Desing & Developed BY Engineer BD Network